February, 2026
Trip No.: - 40
তোমরা সকলেই জানো বর্ধমান শহরের উত্তর দিকে গোলাপবাগের কাছে অবস্থিত রমনা বাগান জুলজিক্যাল পার্ক, যা বর্ধমান শহরে অবস্থিত একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও চিড়িয়াখানা। কিংবদন্তি অনুসারে রামনা নামের এক ডাকাত সেখানে বাগান করে থাকতেন। বর্ধমানের রাজ পরিবার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সেখান থেকে সেই ডাকাতকে উৎখাত করা হয়।
পরবর্তী কালে মহারাজ বিজয় চাঁদ মাহতাব ব্রাহ্ম ধর্মে আসক্ত হওয়ার পর ১৩১১-২১ বঙ্গাব্দে ঐ স্থানে একটি সুন্দর দর্শনীয় বাগান গড়ে তোলেন যার নাম দিয়েছিলেন বিজয় বিহার বা বিজয় বাহার। মহারাজ বিজয় চাঁদ মাহতাব মূলত নিরিবিলিতে সময় কাটানো এবং ধ্যান করার জন্যই এই স্থানটি তৈরি করেন বলে জানা যায়।
গত ১৫ই ফেব্রুয়ারী রবিবার মহা শিবরাত্রির দিন বিকালে ঘুরে এলাম বর্ধমানের রাজকীয় স্থাপত্য সেই বিজয় বাহার থেকে। তাহলে শুরু করা যাক সেদিনের বিজয় বাহার ঘুরে দেখার গল্প।

রমনা বাগান জুলজিক্যাল পার্কের পাশেই অবস্থিত এই বিজয় বাহার। সেদিন বিকাল ৫টায় পৌঁছালাম। ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম বড়ো বড়ো গাছপালায় ঘেরা বেশ নির্জন এক পরিবেশ। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা। কিছুদূর গিয়ে চোখে পড়ল একটি বাঁধানো পুকুর, রাজা এই পুকুরের নাম রেখেছিলেন 'মুক্তি গিরি'।

বিজয়চাঁদ এই বিজয় বাহার তৈরির সময়েই চারদিকে ১২ ফুট উঁচু প্রাচীর তৈরি করেছিলেন। প্রাচীরের চারদিকে শঙ্করাচার্যের শ্লোক লেখার ব্যবস্থা করেন। তিনি মনে করতেন এই এলাকায় আসা মানুষের কাছে এই শ্লোক শিক্ষার ধারা বহন করে আনবে।
পুকুরের উত্তর দিকে রয়েছে এখানে প্রধান মন্দির বিজায়ানন্দেশ্বর শিব মন্দির। দেখলাম সম্প্রতি মন্দিরটি রঙ করা হয়েছে। অনেক ভক্তবৃন্দ শিবরাত্রি উপলক্ষে মন্দিরে পুজো দিতে এসেছিলেন।
মন্দিরের পিছনে একটি উঁচু স্তম্ভ যেখানে চারিদিকে খোদাই করা রয়েছে শঙ্করাচার্যের শ্লোক।
ঘুরতে ঘুরতে পুকুরের পূর্বদিকে পৌঁছে দেখলাম সেখানে দুটি মন্দির রয়েছে। যেখানে একটিতে ‘ওঁ’ লেখা, অন্যটিতে রয়েছে চতুর্ভুজ মহামৃত্যুঞ্জয় শিব। এই দুটি মন্দিরের সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে এবং এখানে অনেক বসার জায়গাও করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষন বসার পর পুকুরের পশ্চিম দিকে এসে দেখলাম সেখানেও রয়েছে আরও দু’টি ছোট মন্দির।
ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কিছু মূর্তি পড়ে রয়েছে। যা ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে জল এবং রোদে। মূর্তিগুলিকে ঢেকে ফেলছে নানা ধরনের আগাছা।
এরপর গেলাম পুকুরের দক্ষিণ দিকে। এখানেই মৃত্যুর পরে বিজয়চাঁদকে সমাধি দেওয়া হয়। রয়েছে সেই সমাধি মন্দিরও।
এই বিজয় বাহারের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে মহারাজ বিজয়চাঁদের মৃত্যুর পর তার ছাই দিয়ে একটি স্মৃতি মন্দির তৈরি করা হয়। রাজ পরিবারে মৃত্যুর পর পোড়া ছাই দিয়ে মন্দির তৈরি করার একটি প্রথা ছিল। এটিকে বলা হয় 'সমাজবাড়ি'। বিজয়চাঁদের স্মৃতি উদ্দেশ্যে নির্মিত সমাজবাড়ির ছবি নিচে দিলাম। এর ভিতরে আগে বিজয়চাঁদের একটি প্রতিমূর্তি থাকত কিন্তু বর্তমানে তা আর নেই।
তার পাশেই আছে ক্যাপ্টেন অভয় চাঁদের সমাধি বেদি, কিন্তু জঙ্গলে ঘেরা থাকায় সেদিকে আর যাওয়া গেলো না।
এই স্থাপত্যগুলি দেখা শেষ করে 'মুক্তি গিরি' পুকুরের দক্ষিণ প্রান্তে এসে সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম সন্ধ্যার বিশেষ মুহূর্তের জন্য। চারিদিকে বেশ একটা গা ছমছমে পরিবেশ। সন্ধ্যার পর চারপাশে জ্বলে ওঠে মশাল।
বিজয়চাঁদ মাহতাব রাজস্থান থেকে লাল বেলেপাথর আনিয়ে নির্মাণ করান এই মন্দিরগুলি। প্রতিটি মন্দির উত্তর-ভারতীয় নগর শৈলীতে নির্মিত।
সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে পুরো পাল্টে গেলো চারপাশের পরিবেশ। চারিদিকে জ্বলে উঠল মশাল। সেই মশালের আলোয় এবং মন্দিরে মন্ত্রোচ্চারণে এমন এক মোহময় আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হল মনে হচ্ছিলো যেন কোনো এক সিনেমার প্লট। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না বর্ধমান শহরের মধ্যে এরকম এক জায়গা থাকতে পারে।
এবছর শিবরাত্রির সন্ধ্যা বেশ একটু অন্যরকম ভাবে কাটলো। সারাবছর এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে। কেবলমাত্র শিবরাত্রির পূণ্যলগ্নে প্রবেশপথ ভক্তদের উদ্দেশ্যে খোলা থাকে। শিবরাত্রিতে বিজায়ানন্দেশ্বর শিব মন্দিরে ঘটা করে পুজো হয়। কলকাতা থেকে আজও আসেন রাজবাড়ির সদস্যরা।
এটা দেখে খুব খারাপ লাগলো বর্তমানে বর্ধমানের এক রাজকীয় স্থাপত্য অবহেলায় পরে রয়েছে। রাজার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে অবশ্যই সংস্কারের প্রয়োজন।
এখনও এই বিজয় বাহারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন মাহতাব ট্রাস্টের সদস্যরা। বিজয় বাহার দেখাশোনার জন্য স্থানীয় একটি পরিবারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যাদের কাজ ছিল উদ্যানের ভিতরে ফুল গাছ লাগানো এবং মন্দিরগুলির পরিচর্যা করা। কিন্তু বিজায়ানন্দেশ্বর শিব মন্দির ছাড়া বাকি চারিদিক অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। আগের বছর বিশেষ সূত্রে এটাও জানতে পারি যে, সারাবছর সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই অর্থের বিনিময়ে ফটোশ্যুট করার জন্য অনেক কেই ভিতরে প্রবেশ করতে দেন।
যাইহোক মহারাজ বিজয়চাঁদ মাহতাবের স্মৃতি এবং স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে এই বিজয় বিহার ও ‘সমাজবাড়ি’-কে বাঁচিয়ে রাখতে অবিলম্বে যথাযথ সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন।
আজ গল্প এই পর্যন্তই। যারা আমার website-এ প্রথমবার গল্প পড়ছো, আমার এই গল্প টি ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই আমার বাকি গল্প গুলো পড়তে ভুলো না। আমার গল্প ভালো লেগে থাকলে নীচে দেওয়া Share link থেকে বন্ধুদের share করো। খুব তাড়াতাড়ি ফিরছি আবার এক travel story নিয়ে। Keep visiting my website...



























