29/06/2026 : Monday
Trip No.: - 59
আজ আমার গল্প যে গ্রামকে নিয়ে তা হলো হুগলি জেলার পুরশুড়া ব্লকের অন্তর্গত দেউলপাড়া, যা একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম। দামোদর নদের তীরে অবস্থিত এই গ্রামের ইতিহাস প্রধানত তার প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত।
এই গ্রামের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার একটি সুপ্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এই মন্দিরটি আজও এলাকার প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন বহন করে।
দামোদর নদের তীরে অবস্থানের কারণে অতীতে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়। তা সত্ত্বেও, দেউলপাড়া তার বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য সমগ্র হুগলি জেলায় একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
আজ বিকালে আমরা দুই বন্ধু ঘুরে এলাম দামোদর নদের তীরে সেই প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির থেকে। জানলাম সেই মন্দির নির্মাণের ইতিহাস। সেই ভ্রমণকাহিনী নিয়েই আজকের আমার এই গল্প।
আমরা বিকাল ৩টায় বর্ধমান থেকে বেরিয়ে NH19 ধরে জৌগ্রাম আসার পর জৌগ্রাম-তারকেশ্বর রোড ধরলাম। জৌগ্রাম স্টেশন পেরোনোর পর এগিয়ে চললাম তারকেশ্বর এর দিকে। বাঁদিকে পরে রইলো ইটলা, গুড়বাড়ি গ্রাম। মনে পড়লো কয়েকমাস আগেই এখানে এসেছিলাম মান সিংহের সময়ের কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনের খোঁজে।
তারকেশ্বর এর কিছু আগে চাউলপট্টি মোড় যখন এসে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে সময় বিকাল ৪:৩০। চাউলপট্টি মোড় থেকে ডানদিকের তারকেশ্বর-কানাড়িয়া রোড ধরলাম এবং প্রায় ১৫মিনিটের মধ্যেই চলে এলাম কানাড়িয়ায় দামোদর নদের উপর ব্রিজ-এ।
ব্রিজের উপর থেকেই দেখতে পেলাম ওই বৌদ্ধ মন্দিরের চূড়া।
এরপর আমরা দামোদর নদ পেরিয়ে দেউলপাড়া গ্রামে প্রবেশ করলাম।
আমরা যখন বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হলাম তখন ঘড়িতে সময় বিকাল ৫টা। প্রবেশ করলাম বৌদ্ধ মন্দিরের ভিতরে। বেশ শান্ত ও মনোরম পরিবেশ। এই বৌদ্ধ মন্দিরের আসল নাম - "ত্রিরত্ন সংঘ শান্তিবন বুদ্ধবিহার"।
এই বৌদ্ধ মন্দির সম্পর্কে কিছু কথা তোমাদের বলে দিই।
হুগলি জেলার পুরশুড়া ব্লকের দামোদর নদের তীরে অবস্থিত এই দেউলপাড়া বৌদ্ধ মন্দির (যা 'ত্রিরত্ন সংঘ শান্তিবন বুদ্ধবিহার' নামেও পরিচিত)। এটি এই জেলার একমাত্র এবং অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী একটি বৌদ্ধ ধর্মস্থান। মনোরম গ্রামীণ পরিবেশে গাছগাছালিতে ঘেরা এই মন্দিরটি হুগলি জেলার পর্যটন মানচিত্রে একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় বাসিন্দা প্রয়াত তারকচন্দ্র বাইরি। তারকচন্দ্র বাইরির মৃত্যুর পর বর্তমানে তাঁর পরিবার (পুত্র প্রতাপ বাইরি এবং পুত্রবধূ প্রমিলা বাইরি) এই মন্দিরের দেখভাল করেন।
কথিত আছে, সস্ত্রীক উত্তর ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে এক বুদ্ধমন্দির দেখে তারকচন্দ্র বাইরির মনের মধ্যে আলোড়ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং পুরশুড়ায় নিজ বাসভবনে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্বোধনের জন্য তিনি ১৪তম দলাই লামা (তেনজিন গিয়াৎসো) -কে আমন্ত্রণ জানান। সেই মতো ১৯৮৫ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৪তম দলাই লামা (তেনজিন গিয়াৎসো) ভারতে এসে এই ‘ত্রিরত্ন সংঘ শান্তিবন বুদ্ধবিহার’-এর উদ্বোধন করে যান।
মন্দিরের মূল উপাসনা কক্ষটি বেশ প্রশস্ত। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বেদির ওপর স্থাপিত শ্বেত পাথরের শান্ত, সমাহিত একটি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি, যা বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল। উপাসনা হলের তিনদিকের দেওয়ালে ভগবান বুদ্ধের জীবনকাহিনীর নানা মুহূর্ত বড় বড় তৈলচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৯ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মন্দির প্রাঙ্গণটি আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফল ও ফুলের বাগানে ঘেরা, যা দর্শনার্থীদের এক পরম শান্তি প্রদান করে।
এখানে প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বুদ্ধ জয়ন্তী অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয়। ওই দিন সকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ ভক্তরা এখানে এসে উপাসনা এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।
প্রায় ১৫-২০ মিনিট নির্জনে এই বৌদ্ধ মন্দিরের ভিতর সময় কাটিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম এবং ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার সময় জৌগ্রাম ঢোকার কিছু আগে মহিন্দরে একটি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা-বিস্কুট খেলাম।
জৌগ্রাম থেকে NH19 ধরার পর বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেলো। আমরা রেনকোট পরে নিলাম। শক্তিগড় পেরোনোর পর শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি, সেই সাথে ঝড় এবং বজ্রপাত। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না; আমরা একটি ফ্লাইওভারের নীচে আশ্রয় নিলাম। প্রায় ২ঘন্টা টানা বৃষ্টির পর আবার বাড়ির পথ ধরলাম।
এই ভ্রমণ কাহিনী এই পর্যন্তই। যারা আমার website-এ প্রথমবার গল্প পড়ছো, আমার এই গল্প টি ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই আমার বাকি গল্প গুলো পড়তে ভুলো না। আমার গল্প ভালো লেগে থাকলে নীচে দেওয়া Share link থেকে বন্ধুদের share করো।
And keep visiting my website...



