October, 2026
Trip No.: - 67পূর্ব বর্ধমান জেলার এই গ্রাম শ্যামসুন্দর এবং বিখ্যাত এই শ্যামসুন্দর ঠাকুরবাড়ির উৎপত্তির ইতিহাস বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ও সামাজিক সংস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না-১ ব্লকের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম এই শ্যামসুন্দর। এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হলো শ্যামসুন্দর কলেজ, যা পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি পরিচিত কলেজ। এই গ্রামের পূর্বে নাম ছিল - "আহার বেলমা"। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ‘আহার বেলমা’ নামটিই শোনেনি। নতুন প্রজন্মের কাছে এই নাম একেবারেই অচেনা।
এই গ্রামের নাম 'আহার বেলমা' থেকে কীভাবে 'শ্যামসুন্দর' হলো - মূলত তা নিয়েই আমার আজকের এই গল্প।
আমার এই গল্প শুরু করব একজন বিশিষ্ট মানুষের জীবনী দিয়ে। তিনি আর কেউ নন, বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাবিদ বিশালাক্ষ বসু।
দক্ষিণ দামোদরের এই আহার বেলমা গ্রাম এক সময় খুবই পশ্চাৎপদ ছিল। এমনই একটি অনগ্রসর এলাকার সমৃদ্ধি এসেছিল যে মানুষটির হাত ধরে সেই বিশালাক্ষ বসু ১৮৮৪ সালের ২৯শে জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামলাল বসু ছিলেন হুগলির বৈদ্যবাটির একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক।পূর্ব বর্ধমানের কামালপুর অঞ্চলের শতাব্দীপ্রাচীন বসু জমিদার পরিবারের সাথে তাঁর বংশগত সংযোগ ছিল।
সেই সময় আহার বেলমায় কোনও স্কুল ছিল না৷ দশ বয়সে বাবার মৃত্যুর পর, পরিবারের আর্থিক অনটনের মধ্যে অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশুনা আর বেশি এগোয়নি তাঁর৷ সতেরো বছর বয়সে তাঁকে পড়াশুনা ছাড়তে হয় রোজগারের আশায়৷
সে সময় নিবারণচন্দ্র সরকার ছিলেন এক কোলিয়ারির মালিক৷ সকলে তাঁকে বলত ‘কোল কিং’৷ বিশালাক্ষ বসুর দাদা নলিনাক্ষ বসু কাজ করতেন নিবারণচন্দ্রের কলকাতা অফিসে। দাদার দৌলতে সেখানেই আমদানি-রফতানি বিভাগে কাজের সুযোগ হয় বিশালাক্ষ বসুর৷
কিছু দিনের মধ্যেই কর্মক্ষেত্রে নিবারণচন্দ্রের সুনজরে আসেন বিশালাক্ষ বসু৷ পরবর্তীকালে নিবারণচন্দ্র তাঁর ভাইঝির সঙ্গে বিশালাক্ষ বসুর বিয়ে দেন।
১৯১৪ -য় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাহাজের আনাগোনা বেড়ে যায় বহু গুণ৷ কয়লার জোগানও বেড়ে যায় বহুগুণ৷ সেই সময় বিশাল ধনসম্পত্তির মালিক হন বিশালাক্ষ বসু এবং আহার বেলমার বেশ কিছু অংশ কিনে নেন তিনি৷ বিশালাক্ষ বসু ভাইসরয় লিথলিংগোর কাছ থেকে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে রায়সাহেব উপাধি এবং ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভাইসরয় ওয়াভেল -এর কাছ থেকে রায়বাহাদুর উপাধি পান। বিশাল ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়ে কৈশোরে ছেড়ে আসা আহার বেলমার উন্নতির জন্য মনোনিবেশ করেন তিনি।
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে পিতার স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা করেন রামলাল প্রাথমিক বিদ্যালয়৷ ১৯৪৫ -এ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় ‘আদর্শ’ কথাটি যোগ করে তৈরি করেন রামলাল আদর্শ বিদ্যালয়৷ ১৯৪৬ -এ তৈরি করেন শ্যামসুন্দর চতুষ্পাঠী৷ এর পর বিশালাক্ষ বসু ১৯৪৮ সালের ১২ অগস্ট প্রতিষ্ঠা করেন শ্যামসুন্দর কলেজ৷ বিশালাক্ষ বসুর উচ্চশিক্ষিত পুত্র শিবমোহন বসু ছিলেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ (Principal)। কিন্তু তিনি সেই সময় নারীশিক্ষার প্রসারে বিশেষ কিছু করে যাননি।
অন্য দিকে ধীরে ধীরে তিনি আহার বেলমায় গড়ে তোলেন একটি বিশাল মন্দির চত্বর৷ ১৯৩৫ -এ প্রথম তৈরি করেন শিবমন্দির৷ ১৯৪২ থেকে ১৯৫০ -এর মধ্যে প্রতিষ্ঠা হয় কুলদেবতা শ্যামসুন্দর, সিংহবাহিনী, গণেশ, লক্ষ্মী, শীতলা, রাম -লক্ষ্মণ -সীতা -হনুমান, বিশ্বকর্মা প্রভৃতি৷ নিত্যপুজো ছাড়াও আজও সারা বছরই সাড়ম্বরে পালিত হয় ঝুলন, রাসযাত্রা, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপুজো, রথ ইত্যাদি৷ এক সময় উৎসব উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষের অন্নভোগের ব্যবস্থা থাকত৷ মন্দির চত্বরের সুদৃশ্য নাটমঞ্চ এবং সাজঘর, দু’টি দীঘি, দীর্ঘ গোশালা আজও সেই পুরনো ঐতিহ্যকে মনে করায়৷
এরপর কুলদেবতা শ্যামসুন্দরের নামানুসারেই বিশালাক্ষ বসু আহার বেলমার নামকরণ করেন শ্যামসুন্দর৷ বিশালাক্ষ বসুর আহ্বানে বিভিন্ন সময়ে শ্যামসুন্দরে এসেছিলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ প্রমুখ ব্যক্তিরা৷
অবশেষে ১৯৫৮ সালের ২২শে জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গত ২৪শে অক্টোবর, শনিবার আমি আর আমার ভাই শুভজিৎ ঘুরে এলাম সেই বিশালাক্ষ বসু দ্বারা প্রতিষ্টিত বিশাল মন্দির চত্বর থেকে। জানলাম বিশালাক্ষ বসু এবং তাঁর প্রতিষ্টিত এই ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য। স্থানীয়রা এই মন্দির চত্বরকে শ্যামসুন্দর ঠাকুরবাড়ি বলে থাকেন।
আমি এই বিশালাক্ষ বসু দ্বারা প্রতিষ্টিত শ্যামসুন্দর কলেজেই পড়াশুনা করেছি এবং সেই সময় একবার এই ঠাকুরবাড়ি এসে থাকলেও তখন খুব বেশি তথ্য জানা হয়নি। তারপর গত ২৪শে অক্টোবর, শনিবার সকাল ৯টায় আমি আর ভাই এসে উপস্থিত হলাম এই ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গনে।
ঠাকুরবাড়ির ভিতর প্রবেশ করে প্রথমেই আমরা দেখতে পেলাম শিবমন্দির। শিবমন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি নাটমন্দির। নাটমন্দিরের পাশে, শিবমন্দিরের বিপরীতেই একটি সুউচ্চ মন্দির দেখতে পেলাম। জানতে পারলাম সেখানেই দোল উৎসব পালিত হয়। তার পাশে রয়েছে বিশ্বকর্মা মন্দির। বিশ্বকর্মা মন্দিরের সামনেই রয়েছে একটি তুলসীমঞ্চ।
এরপর নাটমন্দিরের সামনে এসে দেখতে পেলাম এখানের মূল মন্দির অর্থাৎ সেই বিখ্যাত শ্যামসুন্দর মন্দিরের সামনে।
এই সেই শ্যামসুন্দর মন্দির যার নামানুসারেই বিশালাক্ষ বসু এই গ্রামের নামকরণ করেছিলেন - শ্যামসুন্দর।
তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই এলাকার উন্নতি সম্ভব শুধু শ্যামসুন্দর ঠাকুরের কৃপায়।
এরপর আমরা পাশের মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম সিংহবাহিনী মন্দির। নিত্যপূজার পাশাপাশি প্রতি বছরই দুর্গাপূজার সময় সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালিত হয়।
এরপর গণেশ, লক্ষ্মী, শীতলা, জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা আরও অনেক দেব দেবীর মন্দির দেখতে পেলাম।এখানে প্রতিটি মন্দিরের দেওয়ালে ‘স্ট্যাকো ’ পদ্ধতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লোককাহিনি ও সংস্কৃতির নিদর্শন।
এরপর পিছনদিকের মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে প্রথমেই দেখতে পেলাম বিশালাক্ষ বসুর সমাধি মন্দির। এর পাশেই রয়েছে ভোগ কক্ষ এবং রান্নাঘর। মন্দিরের পুরোহিতদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এখানে প্রতিদিন ভোগ হয় তবে ভোগ গ্রহণ করতে হলে আগে থেকে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে এবং সেরকমই তাঁরা আয়োজন করবেন।
মন্দির চত্বরের বাইরে বিপরীত দিকেই রয়েছে একটি সুবিশাল দীঘি। এবং তার পাশেই রথের ঘর। এখানে রথযাত্রা ধুমধামের সাথে উদযাপন করা হয়।
সকাল ১১টায় মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ঠাকুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে চতুস্পাঠীর পাশ দিয়ে যখন চাতর গ্রামের কালীমন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হলাম দেখতে পেলাম কালীমন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন দোলমঞ্চ, যার গায়ে সমৃদ্ধ টেরাকোটার কাজ দেখতে পেলাম।
দক্ষিণ দামোদরের প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রামীণ জনপদে একসময় শিক্ষার আলোতো ছিলই না এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনের বাজার, পাকা রাস্তা এসব ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু এখন জমজমাট চারপাশ। গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তা, আধুনিক পরিকাঠামো। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই আমূল রূপান্তর যাঁর দ্বারা সম্ভব হয়েছে সেই বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাবিদ বিশালাক্ষ বসুর বিশ্বাস ছিল, শুধু শিক্ষায় নয়, আত্মিক উন্নয়নেও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই শ্যামসুন্দর ঠাকুরের মন্দির—যা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এই এলাকার আধ্যাত্মিক ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
আমি যখন এখানে কলেজে পড়তাম তখনও এতকিছু জানতাম না। সেদিন সকালে ওই শ্যামসুন্দর ঠাকুরবাড়ি ভ্রমণ করে, ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস জেনে, প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাস জেনে এবং সর্বোপরি এই গ্রামের সমৃদ্ধির ইতিহাস জেনে খুবই সমৃদ্ধ হয়েছিলাম।
অতীতের বিভিন্ন সময়ে একাধিক চুরির ঘটনায় বেশ কিছু মূল্যবান বিগ্রহ হারিয়ে গেলেও, এই ঠাকুরবাড়ির ঐতিহাসিক গৌরব ম্লান হয়নি। সব বাধা পেরিয়ে বিশালাক্ষ বসুর অমর সৃষ্টি শ্যামসুন্দর ঠাকুরবাড়ি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে গ্রামের ঐতিহ্য রক্ষা করে।
পরিশেষে, শ্যামসুন্দর গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় শিক্ষিকা প্রিয়া কোনার মহাশয়াকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এই ঠাকুরবাড়ি ও গ্রামের অজানা ইতিহাস এবং নানা মূল্যবান তথ্য দিয়ে তিনি যেভাবে এই লেখাকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেছেন, তা সত্যিই অনবদ্য।
আজ গল্প এই পর্যন্তই। যারা আমার website-এ প্রথমবার গল্প পড়ছো, আমার এই গল্প টি ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই আমার বাকি গল্প গুলো পড়তে ভুলো না। আমার গল্প ভালো লেগে থাকলে নীচে দেওয়া Share link থেকে বন্ধুদের share করো। খুব তাড়াতাড়ি ফিরছি আবার এক travel story নিয়ে। Keep visiting my website...























