March, 2026
Trip No.: - 45.... ১৫ই মার্চ রবিবার সন্ধ্যায় প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে চারিদিকে সবাই যখন আতঙ্কিত হয়ে ঘরে বসে আছে আমরা তিন বন্ধু তখন হদল নারায়ণপুরের ফাঁকা জমিদারবাড়ির উঠোনের নাটমন্দিরে অন্ধকারে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষারত । থেকে থেকেই বিদ্যুতের ঝলকানি আর মেঘের গর্জন চলছে । একটা ভাঙা টিন দূরে কোথাও থেকে উড়ে এসে নাটমন্দিরের ভিতরের একটা পিলারে সজোরে ধাক্কা লেগে নিচে পড়ল । ....
'অ্যাডভেঞ্চার', যার অর্থ হল কোনো দুঃসাহসিক অভিযান। অর্থাৎ সাধারণ জীবনের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু খোঁজার বা অজানাকে জানার এক রোমাঞ্চকর উদ্যোগ। আর অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণ বা 'অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেল' মানে হলো চেনা ছকের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করা, যেখানে রোমাঞ্চ এবং প্রকৃতির এক দারুণ মেলবন্ধন ঘটে।
আজ এখানে এই গল্পে তোমাদের সেরকমই এক অভিজ্ঞতার কথা বলব। তাহলে শুরু করা যাক।
দিনটা ছিল ১৫ই মার্চ রবিবার। আগের দিনই নবদ্বীপ, মায়াপুর থেকে ফ্যামিলি ট্যুর করে ফিরেছি। সকালবেলায় আমরা তিন বন্ধু আমি, ভাস্কর আর দেবুদা ঠিক করলাম বিকালের দিকে কোথাও একটু ঘুরে আসব। ঠিক হল আমরুলে দামোদর নদের পাড়ে যাবো, কাছেই একটা আশ্রম আছে। এই জায়গার কথা আমারই স্কুলের এক সহকর্মী সুদন স্যারের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম। সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে তারপর যদি সময় থাকে হদল-নারায়ণপুর জমিদারবাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসব, যে জমিদারবাড়ির কথা অনেক আগেই শুনেছিলাম, যাওয়া হয়ে ওঠে নি। তখনও বুঝতে পারিনি সন্ধ্যায় আমাদের জন্য ঠিক কি পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।
বিকাল ৩টার কিছু পরে আমরা তিন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম। আমি তো আমার স্কুটার নিয়ে বেরোলাম আর ভাস্করের বাইকে ভাস্কর আর দেবুদা। বর্ধমান থেকে বাঁকুড়া মোড় হয়ে ডানদিকের বাঁকুড়া রোড ধরে কিছুদূর এগিয়ে শশঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত রোড ধরলাম। শশঙ্গা হাই স্কুল পেরিয়ে নপাড়া হয়ে যখন আমরুল এসে পৌঁছালাম, ঘড়িতে সময় বিকাল ৩:৪৫। সামনেই শ্মশান। তারপাশে গাড়ি রাখলাম।
শ্মশানের পাশেই দেখতে পেলাম একটি আশ্রম - যার নাম বিশ্বমানবপ্রেম পঞ্চবটি আশ্রম। গুরুজি সাধন দাস বৈরাগ্য এবং মাকি কাজুমি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আশ্রমটি একটি শান্তিপূর্ণ, প্রকৃতি-ঘেরা ও প্রশান্তিদায়ক স্থান।
সামনেই দামোদর নদ। স্বাভাবিকভাবেই এখন নদীতে জল খুবই কম। নদীবক্ষে দেখতে পেলাম অসম্পূর্ন রেল ওভারব্রিজের কিছু স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। অনতিদূরেই দেখতে পেলাম বর্ধমান শহরে জল সরবরাহের জন্য অম্রুত প্রকল্পের জন্য নদী থেকে জল উত্তোলনের পাইপলাইন। এক কথায় প্রকৃতির কোলে এক টুকরো নির্জন স্থান।
নদীর পারে অসম্পূর্ন রেল ওভারব্রিজের শেষ স্তম্ভের উপর আমরা তিনজন গিয়ে বসলাম। নদীর দিক থেকে বেশ ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। অনেকদিন পর আমাদের তিন জনের একসাথে দেখা হল, তাই সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। আর সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম চা।
কিছুক্ষন গল্পের পর ঠিক হল নদীর বালির উপর দিয়ে একটু হেঁটে যাব। নদীর মধ্যে নেমে বালির উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম তিনজন। এখন নদীতে জল খুবই কম। হেঁটে হেঁটে অনেকদূর গিয়ে জল দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম নদী পারাপারের জন্য অস্থায়ী বাঁশের ব্রিজ।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ইতিমধ্যে ৪:৩০ বেজে গেছে। নদী থেকে উঠে এসে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম হদল-নারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে। তখনও আকাশ একেবারে পরিষ্কার ছিল। ওখান থেকে হদল-নারায়ণপুর ৩৫কিমি।
আমরুল থেকে বেরিয়ে বাঁকুড়া রোড হয়ে চক পাত্রসায়র থেকে ডান দিকের হদল-নারায়ণপুর রোড ধরলাম। বাঁকুড়া জেলায় বোদাই নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত যমজ গ্রাম হদল নারায়ণপুর। চক পাত্রসায়র থেকে যতই হদল নারায়ণপুরের দিকে এগোচ্ছিলাম আকাশ জুড়ে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিলো। যে জমিদার বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছি তা সম্পর্কে কিছু কথা বলে দিই।
মল্ল রাজা গোপালের (১৭২০-১৭৫২) রাজত্বকালে বর্ধমানের নীলপুর থেকে মুচিরাম ঘোষের আগমনের ফলে এই অঞ্চলটি খ্যাতি লাভ করে। পরবর্তীকালে তাঁরা ‘মণ্ডল’ উপাধি লাভ করেন। তখন থেকেই তাঁরা সেই অঞ্চলের জমিদার হন এবং মন্দির নির্মাণ করেন – যেগুলোর মধ্যে কয়েকটি পোড়ামাটির কাজে সমৃদ্ধ এবং অনন্য। এই পরিবারটি বড়ো, মেজো এবং ছোট তরফে বিভক্ত হয়। প্রত্যেক তরফ বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করে যা সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। কিছু পোড়ামাটির অলঙ্করণ সত্যিই সুন্দর এবং এর অপরূপ সৌন্দর্যে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে।

আমরা যখন মন্ডল পরিবারের বড়ো তরফের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালাম তখন আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকারও নেমে এসেছে। থেকে থেকেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাড়ির বাইরেই দেখতে পেলাম একটি ৪০ফুট উঁচু সতেরো চূড়া বিশিষ্ট অষ্টভুজাকার রাসমঞ্চ এবং তার সামনে একটি নাটমন্দির। তার উল্টোদিকেই রয়েছে রথ কক্ষ এবং বাড়ির সামনেই রয়েছে জমিদারবাড়ির পুকুর। বাইরে গাড়ি রেখে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশদ্বারের কাছে একটি সুইচ দেখতে পেয়ে তা চাপ দিতেই একটি আলো জ্বলে উঠল। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কারেন্ট চলে গেল। এখন চারিদিক একেবারেই অন্ধকার, নিস্তব্ধ; শুধু আমরা তিনজন এই বাড়ির উঠোনে। মাঝে মাঝে অন্ধকারের বুক চিরে বিদ্যুতের চমকানিতে চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠছে। বেশ একটা রোমাঞ্চকর গা ছমছমে পরিবেশ।
উঠোনের মাঝেই রয়েছে নাটমন্দির আর তার সামনে দুর্গাদালান। পিছন দিকে রয়েছে পঞ্চরত্ন রাধা-দামোদর মন্দির।
চারিদিক ঘুরে দেখে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির জল গায়ে পড়তে লাগলো। পাশেই ছিল মেজো তরফের নবরত্ন রাধা-দামোদর মন্দির, কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকার ও তার সাথে বৃষ্টি নেমে যাওয়ার কারণে ওদিকে আর গেলাম না।
গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চললাম ছোট তরফের বাড়ির দিকে।
ছোট তরফের বাড়ির সিংহ দরজার বাইরে গাড়ি রেখে ভিতরে প্রবেশ করলাম। এখানেও দেখতে পেলাম উঠোনের মাঝে নাটমন্দির, দুর্গাদালান এবং ৩৫ ফুট উঁচু গির্জার শৈলীতে নির্মিত ছোট তরফের রাধা-দামোদর মন্দির এবং প্রাঙ্গনে আরো দুটি ছোট মন্দির দেখতে পেলাম।
সমস্ত মন্দির গুলিতেই মন্দিরগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত এবং সামাজিক দৃশ্যাবলী সম্বলিত জটিল টেরাকোটার ফলক রয়েছে।
এরপরেই এলো সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬:৩০। আমরা রাধা-দামোদর মন্দির দেখে বাইরে বেড়িয়েছি আর শুরু হলো প্রবল ঝড় আর তার সাথে মুষলধারে বৃষ্টি। আমরা তিনজন আশ্রয় নিলাম দুর্গাদালানের সামনের নাটমন্দিরে। ঝড়ের দাপটে বৃষ্টির জল আমাদের পুরো ভিজিয়ে দিচ্ছিল। থেকে থেকেই বিদ্যুতের ঝলকানি আর তীব্র মেঘের গর্জন চলছে।
একটা ভাঙা টিন দূরে কোথাও থেকে উড়ে এসে নাটমন্দিরের ভিতরের একটা পিলারে সজোরে ধাক্কা লেগে নিচে পড়ল।
কিছুক্ষন পরেই পায়ের কাছে কোনো কিছুর উপস্থিতি টের পেয়ে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে দেখি একটা সাদা বেড়াল বাইরের দুর্যোগের জন্য আমাদের পায়ের কাছে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
নাটমন্দিরে অন্ধকারের মধ্যে ভূতের মতো আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দুর্যোগের রোমাঞ্চ উপভোগ করছি আর ভাবছি - কতক্ষনে এই ঝড়-বৃষ্টি একটু কমবে।

প্রায় ৪৫মিনিট পর ঝড় বৃষ্টি যখন কমে এলো মনে একটু শান্তি অনুভব করলাম। নাটমন্দির থেকে নিচে নেমে দেখি ঝড়ে আমাদের জুতো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বেলে জুতো খুঁজে পড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি স্বাভাবিকভাবেই চারিদিকে জল জমে গেছে। সকলেই রেইনকোট পড়ে নিয়ে এরপর বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।
গাড়ি করে কিছুদূর এগোতেই দেখি রাস্তার উপর ঝড়ে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে আছে।
রাস্তার ধারে ধারে শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, শেয়ালগুলোর পুরো শরীর বৃষ্টিতে সিক্ত।
রাস্তার উপর পরে থাকা ডালপালা পাশ কাটিয়ে, কখনো গাড়ি থেকে নেমে ভাঙা ডালপালা সরিয়ে এগিয়ে চললাম।
গ্রামের রাস্তা থেকে মেন-রোডে উঠে এগিয়ে চললাম বর্ধমানের দিকে।
মেন-রোডে উঠেও আর এক সমস্যা। মাঝে মাঝে রাস্তায় থাকা কাদায় গাড়ির চাকা স্কিড্ করছে; নাইট-ভিশন চশমা পরে থাকলেও উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির জল লেগে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে; মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে চশমা মুছতে হচ্ছে।
এখানেও মেন-রোডে বড়ো বড়ো গাছ ভেঙে পড়েছে। ফলে বড়ো গাড়ি, লরি যাওয়া আসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বাইক বা ছোট গাড়ি শুধুমাত্র কোনো রকমে পেরোচ্ছে।
রসুলপুর বাজারের কাছে এসে একটা বন্ধ দোকানের বাইরে একটা বেঞ্চ দেখতে পেয়ে দাঁড়ালাম। সাথে ছিল ক্যামোমাইল টি। এটা আমার খুব প্রিয় একটি চা, যা প্রশান্তিদায়ক অর্থাৎ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসে সাথে থাকা কুকিজ ও ক্যামোমাইল চা খেতে খেতে আমরা তিনজন বৃষ্টি শেষের নির্জনতা উপভোগ করছিলাম।
অবশেষে চা খেয়ে আবার এগিয়ে চললাম। খণ্ডঘোষ পেরিয়ে যখন খেজুরহাটি এসে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে সময় রাট ৮টা।
দেখলাম একটা ফাস্ট-ফুডের দোকান তখনও খোলা আছে। আমাদের সবারই অল্প খিদে পেয়েছিল।
ওই ফাস্টফুডের দোকান থেকে তিনজন তিনটে এগরোল নিলাম।
এগরোল খেয়ে পুনরায় এগিয়ে যাওয়া।
রাত ৯টার কিছু পরে আমরা অবশেষে বর্ধমান এসে পৌঁছালাম। অনেকটাই রাত হয়ে গেছিলো তাই যে যার বাড়ি চলে গেলাম এবং আমরা ঠিক করলাম আবার একদিন সকালের দিকে ওই হদল-নারায়ণপুর জমিদারবাড়ি যাবো আর ভালো করে সব কিছু দেখব।
গাড়ি তো পুরো কর্দমাক্ত হয়ে ছিল তাই পরের দিন সকালে উঠেই গাড়িটা ভালো করে ধুলাম।
১৫ই মার্চ ওই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আমাদের তিন বন্ধুর যে বিশেষ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হলো তা 'একটি অ্যাডভেঞ্চার' বলা যেতে পারে।
এরপর কেটে গেল আরও একদিন। মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ আবারও গিয়েছিলাম হদল-নারায়ণপুর জমিদারবাড়ি। সেই ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে আসছি পরের গল্পে।
আজকের গল্প এই পর্যন্তই। যারা আমার website-এ প্রথমবার গল্প পড়ছো, আমার এই গল্প টি ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই আমার বাকি গল্প গুলো পড়তে ভুলো না। আমার গল্প ভালো লেগে থাকলে নীচে দেওয়া Share link থেকে বন্ধুদের share করো।






















