Skip to Content

বাংলার বিভিন্ন মন্দির শৈলী এবং তাদের প্রযুক্তিগত বিবর্তন

Style and Technological evolution of Temples of Bengal
7 May 2026 by
বাংলার বিভিন্ন মন্দির শৈলী এবং তাদের প্রযুক্তিগত বিবর্তন
Classic Sarathi
Information Post 

আমাদের এই বাংলার ভূমিতে যুগে যুগে সময়ের পরিবর্তন এর সাথে সাথে সৃষ্টি হয়েছে নানা স্থাপত্যকীর্তি, যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো প্রাচীন মন্দিরসমূহ। বাংলার মন্দির স্থাপত্য একদিকে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন, তেমনই অন্যদিকে তা শিল্প, সমাজ ও ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। 

বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের দিক থেকে বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলোর স্থাপত্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলার মন্দির স্থাপত্য মূলত গড়ে উঠেছিল মধ্যযুগে, বিশেষ করে পাল, সেন আমলে। পরবর্তীকালে মল্ল রাজাদের শাসন আমলে তা আরও বেশি সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। 

প্রত্নতত্ত্ববিদরা বাংলার নিজস্ব মন্দির স্থাপত্যরীতিকে 'বাংলারীতি' নামে অভিহিত করেছেন। বাংলার নিজস্ব রীতিকে 'চালা', 'রত্ন', 'দালান' ও 'মঞ্চ' নামের প্রধান চার শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। 

এছাড়াও রয়েছে উত্তর উড়িশা থেকে আহৃত 'নাগর' শৈলীর বিবর্তিত রূপ 'দেউল' রীতি। এছাড়াও রয়েছে 'মঠ রীতি', 'মিশ্র রীতি' ইত্যাদি। 

Styles of Temples of Bengal


চালা মন্দির

বাংলার খড়ের চালের মাটির ঘরের আদলে তৈরী এই শ্রেণীর মন্দির। এই শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট চালার বাঁকানো শীর্ষ ও কার্নিস। 

দোচালা বা এক বাংলা মন্দির

সামনে পিছনে দুটি ঢালু চাল নামলে সেই মন্দিরকে বলা হয় দোচালা মন্দির বা এক বাংলা মন্দির। 

Dochala temple
জোড় বাংলা মন্দির

মন্দিরের অধিকতর স্থায়িত্বের জন্য যখন দুটি দোচালা বা এক বাংলা মন্দির পাশাপাশি জোড়া থাকে তখন তাকে বলা হয় জোড় বাংলা মন্দির। 

অনেক সময় এর স্থায়িত্বকে আরও দৃঢ় করার জন্য দুটি চালার মাঝে একটি রত্নও বসানো হয়। 

Jor Bangla Temple
চারচালা মন্দির

চারচালা অর্থাৎ চারটি চালার সমাহার। দুই চালার দুপাশ থেকে আরও দুটি চালা নামলে অর্থাৎ চারপাশে চারটি চালা থাকলে সেই মন্দিরকে বলা হয় চারচালা মন্দির। 

Charchala temple
আটচালা মন্দির

আটচালা অর্থাৎ পরপর দুটি চারচালা। নিচের চারচালার উপর অল্প উচ্চতার চারটি দেওয়াল তুলে তার উপর দ্বিতীয় স্তরের আরও চারটি ছোট আকারের চালা বিন্যস্ত হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় আটচালা মন্দির। 

Atchala temple
বারোচালা মন্দির

একই রকম ভাবে আটচালার উপর অল্প উচ্চতার চারটি দেওয়াল তুলে তার উপর তৃতীয় স্তরের আরও চারটি ছোট আকারের চালা বিন্যস্ত হলে হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় বারোচালা মন্দির। 

Barochala temple

রত্ন মন্দির

উপরে বর্ণিত চালা মন্দিরের ছাদের উপরে লম্বা চূড়া বসানো হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় রত্ন মন্দির। বিশুদ্ধ রত্ন মন্দিরের বিশেষত্ত্ব হল চালার বাঁকানো কার্নিশ। 

একরত্ন মন্দির

একটি চারচালা মন্দিরের ছাদের উপরে মধ্যবর্তী স্থানে একটি চূড়া বা রত্ন বসানো হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় একরত্ন মন্দির। 

Ekratna Temple
পঞ্চরত্ন মন্দির

একরত্ন মন্দিরের ছাদের চারকোণে চারটি অপেক্ষাকৃত ছোট রত্ন বসানো হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় পঞ্চরত্ন মন্দির। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একতল পঞ্চরত্ন মন্দির হলেও নদীয়া জেলায় সোনাডাঙায় অন্নপূর্ণা মন্দিরটি দ্বিতল পঞ্চরত্ন মন্দির। 

Pancharatna Temple
নবরত্ন মন্দির

একটি আটচালা মন্দিরে নিচের চারচালার চার কোনে চারটি এবং উপরের চারচালার চার কোনে চারটি রত্ন বসিয়ে উপরে মাঝখানে একটি অপেক্ষাকৃত বড়ো রত্ন বসানো হলে সেই মন্দিরকে বলা হয় নবরত্ন মন্দির। 

Nabaratna temple

এভাবে রত্নের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৩, ১৭, ২১, ২৫ রত্ন মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। যেমন কালনা রাজবাড়ী ক্যাম্পাসে গোপালজি মন্দিরটি পঁচিশ রত্ন মন্দির। 

মুর্শিদাবাদ গেলে দেখতে পাওয়া যায় সেখানকার রত্ন মন্দিরগুলির কেন্দ্রীয় চূড়াটি হয় অতি বৃহৎ, কিন্তু কোনের রত্নগুলি অতি ক্ষুদ্র। 

দালান মন্দির

এই মন্দিরে বাঁকানো কার্নিশ থাকে না। সামনে খিলানযুক্ত অলিন্দসমেত সমতল ছাদের মন্দিরকে বলা হয় দালান মন্দির। 

তবে চারটি বা তার বেশি খিলানযুক্ত অলিন্দবিশিষ্ট মন্দিরগুলিকে দালান এবং তিনটি বা তার কম খিলানযুক্ত অলিন্দবিশিষ্ট মন্দিরগুলিকে চাঁদনী নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। 

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শামিয়ানা টাঙানোর মতো চারিদিক খোলা কয়েকটি স্তম্ভের উপর স্থাপিত সমতল ছাদবিশিষ্ট নির্মাণকে চাঁদনী বলাই শ্রেয়। 

এই চাঁদনী বা দালান একতল অথবা দ্বিতল হয়ে থাকে। 

Chandni temple


এই চাঁদনী সাধারণত পুকুরঘাটে অথবা বিভিন্ন মন্দিরের সামনে নাটমন্দির হিসাবে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন ব্যারাকপুরের অন্নপূর্ণা মন্দিরের সামনের নাটমন্দির, দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মন্দিরের সামনের নাটমন্দির ইত্যাদি। 

Natmandir
দুর্গাদালান

দুর্গাদালান হলো বাংলার পুরনো বনেদি বাড়ি বা রাজবাড়ির অঙ্গনে অবস্থিত একটি পাকা দালান, যা মূলত প্রতি বছর ধুমধাম করে দেবী দুর্গার আরাধনা বা দুর্গাপূজার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

অনেক দুর্গাদালানে বাংলার সুলতানি বা উপনিবেশিক স্থাপত্যের ছাপ দেখা যায়। 

এই দুর্গাদালান বাড়ির লাগোয়া স্থানে বা বাড়ির সাথে যুক্ত দুই রকমই হতে পারে। 

Durgadalan

মিশ্র মন্দির শৈলী

মিশ্র শৈলী অর্থাৎ একাধিক শৈলীর মিশ্রণ। অনেক সময় দেখা যায় এক শ্রেণীর মন্দিরের উপরে অন্য রীতির নির্মাণ হয়েছে। যেমন দালানের উপর একরত্ন, পঞ্চরত্ন, নবরত্ন; দালানের উপর চালা মন্দির ইত্যাদি। এই ধরণের মন্দির শৈলীকে বলা হয় মিশ্র শৈলী। 

যেমন নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে আনন্দময়ী কালীমন্দির। এই মন্দিরটি মূলত দালান ও চারচালা শৈলীর মিশ্রণ।

মঞ্চ মন্দির শৈলী

মঞ্চ মন্দির শৈলী হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যের একটি বিশেষ ধারা, যা দেখতে অনেকটা উচু মঞ্চ বা স্টেজের মতো। 

রাসমঞ্চ

এটি অপেক্ষাকৃত বড় মঞ্চ শৈলী। সাধারণত আটকোণা হয়ে থাকে। মঞ্চের ছাদে নানারকম রীতি দেখা যায়। 

রাস উৎসব পালনের জন্য এই মঞ্চ ব্যবহার করা হয়। রাস উৎসবের সময় বিগ্রহ স্থাপনের পর যাতে সব দিক থেকে দেখা যায় তাই সব দিক খোলা থাকে। 

Rasmancha
দোলমঞ্চ

রাসমঞ্চের তুলনায় এটি অপেক্ষাকৃত ছোট মঞ্চ শৈলী। সাধারণত চারকোণা হয়ে থাকে। মঞ্চের ছাদে নানারকম রীতি দেখা যায়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চারচালা বা আটচালা হয়ে থাকে। 

দোল উৎসব পালনের জন্য এই মঞ্চ ব্যবহার করা হয়। রাস উৎসবের সময় বিগ্রহ স্থাপন করা হয় এবং এখানেও খিলান সহযোগে সব দিক খোলা থাকে। 

Dolmancha
তুলসীমঞ্চ

সবচেয়ে ছোট মঞ্চ শৈলী। এটি হল পবিত্র তুলসী গাছ রোপণ ও পূজার জন্য নির্মিত একটি বিশেষ বেদী বা ছোট কাঠামো। 

এটি সাধারণত বাড়ির উঠোনের উত্তর, উত্তর-পূর্ব বা পূর্ব দিকে স্থাপন করা হয়। 

Tulsimancha

দেউল মন্দির শৈলী

দেউল মন্দির শৈলী হলো বাংলার প্রাচীনতম ও প্রধান ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী, যা মূলত ৬ষ্ঠ-১০ম শতাব্দীর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল। এই শৈলী ওড়িশার রেখ দেউল দ্বারা অনুপ্রাণিত, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো একটি সুউচ্চ ইটের কাঠামো এবং ওপরের দিকে বক্রাকার চূড়া বা শিখর। এখানে মন্দির ভূমি থেকে বক্রাকারে ওপরের দিকে উঠে একটি বিন্দুতে মেশে। অধিকাংশ দেউল মন্দির ইট দিয়ে নির্মিত। 

এতে সাধারণত কোনো সমবেত কক্ষ (জগমোহন) থাকে না, কেবল গর্ভগৃহ থাকে। 

যেমন- বাঁকুড়ার বহুলারা, ইছাই ঘোষের দেউল প্রভৃতি। 

মঠ স্থাপত্য

মঠ স্থাপত্য হলো সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের বাসস্থান ও সাধনার স্থান, যা সাধারণত শান্ত ও সুদূরপ্রসারী পরিবেশ তৈরি করে। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো হিন্দু, ইসলামিক, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান স্থাপত্যের সংমিশ্রণ, যা বিশ্বজনীন বিশ্বাসের প্রতীক। বেলুড় মঠের মতো বিখ্যাত মঠগুলো এই বৈচিত্র্যময় শৈলী ধারণ করে। 

Belur Math


মঠ এবং মন্দির দুটি ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
মন্দির হলো মূলত জনসাধারণের উপাসনা, প্রার্থনা ও দেব-দেবীর পূজার স্থান। অন্যদিকে, মঠ হলো সন্ন্যাসী বা সাধুদের বসবাস, শিক্ষা, ধ্যান ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র, যার প্রধানকে 'মহন্ত' বা 'মঠাধিপতি' বলা হয়। 

উপরের এই স্থাপত্য শৈলী ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন মন্দিরে বিভিন্ন ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলী দেখা যায় যাকে নিজস্ব মন্দির শৈলী বলা হয়। 

যেমন অনেক মন্দিরের ছাদে অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ দেখা যায় যাকে গম্বুজ শৈলী বলা হয়। 

অম্বিকা কালনার গিরিগোবর্ধন মন্দিরের চালে এলোমেলো শিলাখণ্ডের সাহায্যে পাহাড়ের রূপ দেওয়া হয়েছে। 

হুগলি জেলায় হংসেশ্বরী মন্দিরও তার অত্যন্ত অনন্য এবং ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর জন্য পরিচিত। এখানে আট কোণে ৮টি, মাঝের স্তরে ৪টি এবং কেন্দ্রে ১টি—মোট ১৩টি বিশেষ আকৃতির মিনার বা চূড়া রয়েছে। 


বাংলার মন্দিরসমূহের উপাদানগত শৈলী এবং প্রযুক্তিগত বিবর্তনের ইতিহাস


বাংলার শিল্পকলা, যা মূলত ধর্মীয় প্রকৃতির ছিল, তা মন্দিরের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলার ইটের মন্দিরগুলি (ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত) ভারতের পবিত্র স্মৃতিস্তম্ভগুলির অন্যতম। এই সময়কালে এই অঞ্চলের উপর একাধিক শৈল্পিক প্রভাবের কারণে বাংলার ইটের মন্দিরগুলিতে নির্মাণশৈলী এবং কৌশলের ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়। তাই মন্দিরগুলি তাদের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে একটি সুসংহত ধারা গঠন করে, যা বৈশিষ্ট্যগতভাবে ইট এবং পোড়ামাটির মাধ্যমে প্রকাশিত।

 বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়:

  1. আদি হিন্দু (দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত, পশ্চিমাঞ্চলে আরও পরে)
  2. সুলতানি শাসন (চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগ)
  3. হিন্দু পুনরুজ্জীবন (ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী)

আদি হিন্দু যুগে বাংলার মন্দিরগুলি ভারতের ময়ূর্য ও প্রাক-ময়ূর্য শিল্পকলার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল। এই প্রাথমিক পর্যায়ে, পোড়ামাটির শিল্পকর্মগুলি ছিল ছোট আকারের বিক্ষিপ্ত পূজা-প্রদর্শনীর নিদর্শন। পরবর্তীকালে মন্দিরের সম্মুখভাগের অলঙ্করণ হিসেবে পোড়ামাটির শিল্পকর্মগুলি আরও বড় আকারে দেখা যায়।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে সিকান্দার শাহের নেতৃত্বে মুসলমানরা ভারতে এলে বাংলা প্রথমবারের মতো একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মন্দিরের কাঠামোতে পুরোনো হিন্দু কর্বেলিং পদ্ধতি থেকে ইসলামিক ভল্ট, গম্বুজ এবং কীস্টোন আর্চের দিকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ , মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের একটি স্বতন্ত্র বাঙালি শৈলী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।মন্দিরের সজ্জায় সমসাময়িক সমাজের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিক চিত্রিত হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্মিত মন্দিরগুলি আকারে ছোট ছিল এবং সেগুলিতে পোড়ামাটির সজ্জাও কম ছিল, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল সামনের দিকে দেখা যেত। বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধির কারণে বাংলায় যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তার ফলেই এমনটা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

প্রাক-মুসলিম যুগের মন্দিরগুলির কিছু অবশিষ্ট প্রমাণ থেকে বলা যায় যে, প্রধানত লম্বা বক্রাকার রেখা দেউল মন্দির নির্মিত হয়েছিল। এই গোষ্ঠীর প্রাচীনতম মন্দির যা এখনও টিকে আছে তা হল বরাকরের সিদ্ধেশ্বরী মন্দির।

প্রাক-মুঘল বাংলায় প্রাপ্ত আরেকটি সমানভাবে প্রচলিত মন্দির গোষ্ঠী হলো স্তরীভূত পিরামিড আকৃতির চূড়াবিশিষ্ট মন্দির, যা পীরহা বা ভদ্র দেউল নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে পীরহা দেউলের উপরে রেখা শিখর (রেখা দেউল) মন্দিরের একটি সংমিশ্রণ গড়ে ওঠে।

হিন্দু আমলের প্রথম ও পরবর্তী সময়ে বাংলায় যে ধর্মীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তা মন্দির স্থাপত্যেও কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসে। প্রচুর পরিমাণে রেখা দেউল মন্দির নির্মিত হতে থাকে। তার সাথে দুটি সম্পূর্ণ নতুন শৈলীর আবির্ভাব ঘটে – কুঁড়েঘর শৈলী এবং চূড়াবিশিষ্ট শৈলী।

মন্দির নির্মাতাদের ইতিহাস

বাংলায় কেবল দুটি বর্ণপ্রথার সন্ধান পাওয়া যায় – আচার্য এবং সূত্রধর। বাংলার মন্দিরের পোড়ামাটির ভাস্কর্যগুলো এই শিল্পীদের উল্লেখযোগ্য অবদান।

কালক্রমে সূত্রধররা পাথর, হাতির দাঁত, ধাতু ইত্যাদির মতো উপকরণ ব্যবহারে সক্ষম হন এবং দক্ষ শিল্পী হয়ে ওঠেন। সূত্রধররা দলবদ্ধভাবে কাজ করতেন এবং প্রতিটি দল কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত ছিল। তারা আচার্যদের অধীনে বাস করত ও কাজ করত। এই দলগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করত। এই দলগুলোর প্রধানদের কাছে বিভিন্ন আকার ও আকৃতির মন্দিরের তৈরি মূল নকশা থাকত এবং তারা সেই নকশাগুলো নিজেদের সাথে বহন করতেন।

এই শিল্পীদের মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কিত জ্ঞান মূলত স্থানীয় বাঙালি কবিদের রচনা, বিশেষত জনপ্রিয় নাটক ও গানের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। গ্রামের সমাবেশে গল্পকথকদের দ্বারা পুরাণের বিভিন্ন মহাকাব্য আবৃত্তি করা হতো এবং তা নিঃসন্দেহে তৎকালীন পোড়ামাটির শিল্পীদের প্রভাবিত করেছিল।

মন্দির নির্মানের উপকরণ এবং কৌশল

বাংলার মন্দিরগুলিতে বিভিন্ন ধরনের শৈলী ও কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  1. উত্তর ভারত, বিশেষত উড়িষ্যার মন্দির স্থাপত্য: পাথরের স্তরে স্তরে নির্মিত ফাঁপা অভ্যন্তরযুক্ত বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত মিনার।
  2. বৌদ্ধধর্মের সাথে সম্পর্কিত মন্দির স্থাপত্যে, ভুসোয়া ইট একটার পর একটা বসিয়ে সূচালো খিলান ও ভল্ট তৈরি করা হতো।
  3. সুলতানি আমলের স্মারক স্থাপত্য: বাংলার স্থানীয় নির্মাণ সামগ্রী ইট ব্যবহার করে গম্বুজ, খিলান, ভল্টের মতো ইসলামি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এই স্থাপত্যগুলোকে আরও স্থায়ী করার জন্য স্থানীয় নির্মাণশৈলীর অনুকরণও করা হয়েছিল। যেমন, ইটের ভল্টে কুঁড়েঘরের আকৃতি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে এবং এর সাথে বক্রাকার কার্নিস ও পোড়ামাটির সম্মুখভাগের অলঙ্করণ যুক্ত করা হয়েছে।
  4. মুঘল স্থাপত্য: এর পৃষ্ঠতল প্রধানত প্লাস্টার-সজ্জিত এবং অভ্যন্তরীণ স্থানগুলির ছাদ বিভিন্ন ধরণের খিলানযুক্ত শৈলীতে ছাওয়া থাকে, বিশেষত অগভীর সূচ্যগ্র ক্রস-ভল্ট এবং বর্গাকার ও অষ্টভুজাকার নকশায় বক্রাকার খিলানযুক্ত সমতল ছাদ।

বাংলায় মন্দির নির্মাণ শৈলীগুলির মধ্যে প্রধান ছিল চালা বা কুঁড়েঘর শৈলী, চূড়া বা রত্ন শৈলী এবং সমতল ছাদ বা দালান শৈলী - এগুলি নিয়ে প্রথমেই বলেছি। রত্ন শৈলী ষোড়শ শতাব্দীতে উদ্ভূত হয়েছিল বলে মনে হয় এবং এটি বিষ্ণুপুরের একজন মল্ল রাজার প্রিয় শৈলী ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার স্থাপত্য ইউরোপীয় প্রভাবে আসে, যেখানে স্থাপত্যের অভ্যন্তরভাগ গম্বুজাকৃতির হলেও তা অগভীর খিলান দ্বারা আবৃত থাকত এবং পরবর্তীকালে ছাদ সমতল করা হতো। সমতল ছাদযুক্ত মন্দিরের একটি সাধারণ উদাহরণ হলো ষোড়শ শতাব্দীতে বার্ষিক পূজার জন্য নির্মিত দুর্গাদালান। 

পাথরের স্বল্পতার কারণে বাংলায় পাথরের মন্দির প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলায় পাথরের মন্দিরগুলি বেশিরভাগই বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে পাওয়া যায়, কারণ সেই অঞ্চলগুলিতে মোটা দানার ল্যাটেরাইট প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। বাংলায় অঞ্চলভিত্তিক উপকরণের প্রাপ্যতা নীচে বর্ণনা করা হলো:

  • মোটা দানার ল্যাটেরাইট: মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলা
  • হলুদ বারাকা বেলেপাথর: উত্তর বর্ধমান ও সংলগ্ন পুরুলিয়া।
  • স্থানীয় বেলেপাথর: বীরভূম
  • সূক্ষ্ম দানাযুক্ত ক্রিমসন ল্যাটেরাইট: বোলপুর-সিউরি-রামপুরহাট 

ভালো পলিমাটির প্রাচুর্যের কারণে মন্দিরগুলি খুব কমই পাথর দিয়ে নির্মিত হত। বাংলার অধিকাংশ মন্দিরই ভালোভাবে পোড়া ইট দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এই ইটের আকার শুধু অঞ্চলভেদে নয়, বরং একই মন্দিরের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন হত। 

সাধারণত ইটগুলো টানাভাবে গাঁথা হতো এবং ফাঁক পূরণের জন্য ও পরপর উল্লম্ব জোড় এড়ানোর জন্য অর্ধেক ইট ব্যবহার করা হতো।

খিলানের ক্ষেত্রে, ইট কেটে ক্রমশ সরু হয়ে আসা ভুসোয়া (voussoir) তৈরি করা হয়। খিলান তৈরির পাশাপাশি মন্দিরের কার্নিস ও ছাদের স্ফীত রূপরেখা ফুটিয়ে তুলতেও ইটের বাঁকা স্তর ব্যবহার করা হয়। কখনও কখনও সহায়ক খিলান ও পেন্ডেন্টিভ অলঙ্করণের জন্য ইট তির্যকভাবে বসানো হয়।

ইট গাঁথার জন্য ব্যবহৃত চুন-সুরকি গুঁড়ো ইট এবং চুনের মিশ্রণ থেকে তৈরি করা হত (চুন শামুকের খোলস প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যেত)। ছাদ, খিলান এবং দেয়ালের কাজ নদীর বালির সাথে শামুকের চুন মিশিয়ে তৈরি করা হত।

বিশেষ করে মল্ল রাজাদের আমলে (যেমন- বিষ্ণুপুরের রাজারা) ১৬শ-১৭শ শতাব্দীতে টেরাকোটা শিল্পের চরম বিকাশ ঘটে।

মন্দিরের অলংকরণ

শুরুর দিকের কাজগুলো প্রধানত হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর হলেও, পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য, যুদ্ধের দৃশ্য, রাজকীয় শোভাযাত্রা এবং ইউরোপীয় প্রভাবও টেরাকোটা ফলকে ফুটে ওঠে।

Terracotta decoration in Temples


বাংলা মন্দিরের সম্মুখভাগের অলঙ্করণ চিত্রধর্মীও। খিলানযুক্ত প্রবেশপথের উপরের ফলকে, পাশাপাশি চারপাশের দেয়ালে, উঁচু বেষ্টনী ও স্তম্ভশীর্ষে, ভিত্তি ও কার্নিসে, স্তম্ভ এবং খিলানে খোদাইকর্ম দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের মন্দিরের তুলনায় এই সম্মুখভাগের অলঙ্করণে, বিশেষ করে এর ভাস্কর্যময় বিবরণে, অধিকতর সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর থেকে মন্দির নির্মাণশৈলীতে নব্য-ধ্রুপদী রূপের আবির্ভাব ঘটে। ধনী বাঙালিদের মধ্যে পোশাক ও শিক্ষায় ইউরোপীয় শৈলীর জনপ্রিয়তা স্থাপত্যেও প্রকাশ পেয়েছিল। মন্দিরের সম্মুখভাগে রাজকীয় শোভাযাত্রা, নৌবিহার, অভ্যর্থনা, বিভিন্ন ধরনের পশু নিয়ে শিকারের মতো বিষয় দেখা যায়।

যুদ্ধক্ষেত্র, সমসাময়িক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত যোদ্ধা, সঙ্গীত, নৃত্যশিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্রীদের উপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছিল। গ্রাম ও নগর জীবনের সাধারণ দৃশ্যসমূহ পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে দেখানো হতো।

মন্দির শিল্পকলার অবনতি

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ধনী বাঙালিদের ক্রমবর্ধমান পাশ্চাত্য প্রভাব এবং নতুন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে কলকাতার উত্থানের কারণে মন্দির শিল্পকলার হ্রাস পায়। ফলে, যে কারিগররা সর্বদা এই স্থানীয় কাজের উপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ মন্দিরগুলিতে টেরাকোটার কাজের পরিবর্তে স্টাকোর কাজ শুরু হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীতে, ইস্পাত ও কংক্রিটের মতো আধুনিক উপকরণের ব্যবহারের ফলে টেরাকোটা ও ইট দিয়ে মন্দির নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যায়। 

References

  1. Brick Temples of Bengal: From the Archives of David McCutchion. Edited by George Michell :- amazon.in
  2. An Introduction to Bengal Temples Through The Lens. By Asis Kumar Chatterjee :- amazon.in
  3. Terracotta Temple Artwork of Undivided Bengal. Edited by Dr Shilpi Roy :- ibpbooks.in 
  4. Temple to Love : Architecture and Devotion in Seventeenth-Century Bengal :- dokumen.pub 

 

Share the Article

If you like my article share this post with your friends... 


বাংলার বিভিন্ন মন্দির শৈলী এবং তাদের প্রযুক্তিগত বিবর্তন
Classic Sarathi 7 May 2026
About Me

Professionally I am a school teacher, but travelling is my passion. Frequently I go out alone with my scooter and explore beautiful places. 

This blog website is made with stories about my travelling.

Read the stories, watch the photos, feel the places and motivate yourself.

Archive
⚠️ Say No to Piracy

Any reproduction or illegal distribution of my digital contents in any form will result in immediate action against the person concerned. Don’t use any of my contents without my own permission.

If you want to use my contents feel free to contact me here: - office@classicsarathi.in.

Tips for riders who travel via bike or scooter
Special tips for riders who travel via bike or scooter as per my opinion.